"বিচারের দিনের প্রমাণ কী?" -- --- প্রমাণটি তোমার ভেতরেই লুকিয়ে আছে।"
আল্লাহ প্রতিটি প্রাণীকে 'ইন্সটিঙ্কট' বা সহজাত প্রবৃত্তি দিয়েছেন, যেন সে এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে (সার্ভাইভ করতে) পারে। তাই একটি সিংহ হরিণ শিকারের আগে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকে, যেন হরিণটি পালিয়ে না যায়। এটি একটি সচেতন প্রচেষ্টা (conscious act)। পাখি যখন বাসা তৈরি করে কিংবা ডিম রক্ষা করে, সেগুলোও সচেতন প্রচেষ্টা। প্রতিটি জীবই এভাবে নিজের প্রবৃত্তি অনুযায়ী জীবন রক্ষার জন্য নানাবিধ সচেতন কাজ করে থাকে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো—সার্ভাইভাল বা টিকে থাকা।
এবার যদি আমরা এক পা পিছিয়ে জড়বস্তুর দিকে তাকাই, তবে দেখব সেগুলোরও একটি নির্দিষ্ট কার্যকরী উদ্দেশ্য (functional purpose) আছে। ধাতুর উদ্দেশ্য আছে, কাঠের উদ্দেশ্য আছে, আগুনেরও নির্দিষ্ট কাজ আছে। অর্থাৎ, নিম্নস্তরে জড়বস্তুর আছে কার্যকরী উদ্দেশ্য, আর জীবজগতের উদ্দেশ্য হলো জীবনের সংরক্ষণ (preservation of life)।
কিন্তু মানুষের বেলায় কী ঘটে? মানুষকে এমন কিছু দেওয়া হয়েছে যা সৃষ্টিজগতের অন্য কাউকেই দেওয়া হয়নি; আর তা হলো—'রূহ'। এই রূহের রয়েছে আরও উচ্চতর আদর্শ (higher ideals)—যেমন ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সাম্য, ভালোবাসা, কল্যাণ এবং সত্য।
বিশ্বজগতের সবকিছুরই যদি কোনো না কোনো উদ্দেশ্য থেকে থাকে, তবে আমাদের এই রূহেরও নিশ্চয়ই একটি মহৎ উদ্দেশ্য আছে। আমাদের কেন ভালো-মন্দের জ্ঞান দেওয়া হলো? কেন দেওয়া হলো ন্যায়বিচারের বোধ? কেন আমাদের ভেতরে দানশীলতা, দয়া, সহমর্মিতা বা করুণার মতো উচ্চতর অনুভূতিগুলো গেঁথে দেওয়া হলো?
এগুলোর অবশ্যই আরও উচ্চতর কোনো উদ্দেশ্য থাকতে হবে। সমস্যা হলো, মানুষের আগের স্তরের যত চেতনা (consciousness) আছে, তার সবই এই পার্থিব জগৎকেন্দ্রিক। তাই সেগুলোর উদ্দেশ্য এই দুনিয়াতেই পূরণ হয়ে যায়। কিন্তু রূহ তো এই দুনিয়ার কোনো উপাদান নয়; তাই এর উদ্দেশ্যও এই দুনিয়ায় সীমাবদ্ধ হতে পারে না।
আমাদের এই উচ্চতর বিবেক বা চেতনা দেওয়া হয়েছে যেন আমরা শুধু এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াতেই নয়, বরং শেষ বিচারের দিনেও সফল হতে (সার্ভাইভ করতে) পারি। আর ঠিক এই কারণেই, প্রতিবার যখনই আমরা আমাদের সেই বিবেককে লঙ্ঘন করি, রূহের পবিত্রতা নষ্ট করি, তখনই আমাদের ভেতরে একটা তীব্র অপরাধবোধ বা খারাপ লাগা কাজ করে। আমাদের এই খারাপ লাগার অনুভূতিটা যেন ভেতর থেকে চিৎকার করে বলতে থাকে—"এই যে! তুমি কি ভুলে গেছ যে তোমার সামনে এক মহা বিচারের দিন আসছে?"
মানুষের অন্তরে আল্লাহ একটি নৈতিক অ্যালার্ম সিস্টেম সেট করে দিয়েছেন, যাকে বলা হয় 'গিল্টি কনসেন্স' (guilty conscience) বা অনুতপ্ত বিবেক। এটি মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে তাকে আরও উন্নত উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর সেই উদ্দেশ্যটি কী? শেষ বিচারের দিন।
ঠিক এখান থেকেই আমরা বুঝতে পারি, কেন আল্লাহ সূরা কিয়ামাহ-র শুরুতে এই দুটি বিষয়ের মধ্যে একটি গভীর সংযোগ তৈরি করেছেন: "লা উকসিমু বিইয়াওমিল কিয়ামাহ, ওয়া লা উকসিমু বিন-নাফসিন লাউওয়ামাহ"—শপথ কিয়ামত দিবসের এবং শপথ সেই আত্মার, যা নিজেকে ধিক্কার দেয়।
কেন এই দুটি ধারণাকে আল্লাহ একসাথে জুড়লেন? এটি এক পরম বিস্ময়! আপনার ফোনের অ্যালার্ম যেমন আপনাকে কোনো কাজের কথা মনে করিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি আমাদের ভেতরের এই অপরাধবোধ বা 'গিল্ট' হলো এক আধ্যাত্মিক অ্যালার্ম, যা আমাদের শেষ বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা স্মরণ করায়। আল্লাহ এটি আমাদের স্বভাবজাত প্রকৃতির (ফিতরাত) অংশ করে দিয়েছেন।
এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে—"বিচারের দিনের প্রমাণ কী?" কুরআন অত্যন্ত গভীরভাবে তার উত্তর দেয়: "তোমার নিজের সত্তার দিকে তাকাও; প্রমাণটি তোমার ভেতরেই লুকিয়ে আছে।"
—নোমান আলী খান
— সূরা আল কিয়ামাহ ১ম পর্বের আলোচনা থেকে।
— বায়্যিনাহ
