বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

আজান শুনে মাত্র একটা দোয়া পড়লে নবীজি (সা.) কিয়ামতের দিন শাফাআত করবেন।

আসসালামু আলাইকুম

আজান শুনে মাত্র একটা দোয়া পড়লে নবীজি (সা.) কিয়ামতের দিন শাফাআত করবেন — এই প্রতিশ্রুতি বুখারিতে সহিহ

দিনে পাঁচবার আজান হয়। পাঁচবার সেই একই ডাক আসে — "আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাউম," নামাজ ঘুমের চেয়ে উত্তম। আমরা সেই ডাক শুনি, উঠি, নামাজে যাই — বা কখনো যাই না। কিন্তু আজানের ঠিক পরে এমন একটা সুযোগ আসে, যেটা আমাদের অনেকেই জীবনে হাজার হাজারবার মিস করে চলেছি। সেই সুযোগটা কী — নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বলে দিয়েছেন।

(আমার জন্ম ১৯৯২ সালে - জীবিত থাকলে দ্বীনের পথে অটল থাকার আর না থাকলে কবরের আযাব থেকে রক্ষার আমার জন্য দোয়া করবেন) 

হাদিসটা শুনুন —

مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ: اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلاَةِ القَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الوَسِيلَةَ وَالفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ، حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ القِيَامَةِ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রাব্বা হাযিহিদ দাওয়াতিত তাম্মাহ, ওয়াস সালাতিল কাইমাহ, আতি মুহাম্মাদানিল ওয়াসিলাতা ওয়াল ফাদিলাহ, ওয়াবআসহু মাকামাম মাহমুদানিল্লাযি ওয়াআদতাহ — হাল্লাত লাহু শাফাআতি ইয়াওমাল কিয়ামাহ।




অর্থ: যে ব্যক্তি আজান শুনে বলে — হে আল্লাহ, এই পূর্ণাঙ্গ আহ্বান ও প্রতিষ্ঠিত সালাতের রব! মুহাম্মাদকে দান করুন উসিলা ও শ্রেষ্ঠত্ব, আর তাঁকে সেই প্রশংসিত স্থানে পৌঁছে দিন যার প্রতিশ্রুতি আপনি দিয়েছেন — তার জন্য কিয়ামতের দিন আমার শাফাআত অবধারিত হয়ে যায়। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬১৪)

একটু থামুন এই হাদিসের শেষ কথাটায়। "হাল্লাত লাহু শাফাআতি" — তার জন্য আমার শাফাআত অবধারিত হয়ে যায়। "হাল্লাত" শব্দটা আরবিতে এমন কিছু বোঝায় যা নিশ্চিতভাবে পাওনা হয়ে যায়, যেমন একটা ঋণ পরিশোধ বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। অর্থাৎ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন — যে এই দোয়াটা পড়বে, কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফাআত করা আমার দায়িত্ব হয়ে যায়।

শায়খ উসামা আল-শুরাফা আখিরাতের ম্যানুয়ালের নবম অধ্যায় "দৈনন্দিন কর্মসূচি"-তে এই ধরনের আমলগুলোকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন — যেগুলো দেখতে ছোট, কিন্তু আখিরাতে তার প্রতিদান অকল্পনীয়। কারণ এই আমলগুলোর সাথে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সরাসরি সংযোগ আছে।

এবার একটু ভাবুন — শাফাআত কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কিয়ামতের দিন প্রতিটা মানুষকে একা দাঁড়াতে হবে। সেই ভয়াবহ দিনে একজন সুপারিশকারী থাকলে কী হয় — আর সেই সুপারিশকারী যদি হন স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম — তাহলে সেই মানুষটার অবস্থা কেমন হবে? এই ভাবনাটাই এই ছোট্ট দোয়ার পেছনের বিশাল মূল্যটা বুঝিয়ে দেয়।

এই দোয়াটার আরেকটা সৌন্দর্য আছে — এটা মূলত নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য দোয়া। আপনি আল্লাহর কাছে চাইছেন নবীজিকে জান্নাতে সর্বোচ্চ স্থান "ওয়াসিলা" দেওয়া হোক। অর্থাৎ এই দোয়ায় আপনি নিজের জন্য কিছু চাইছেন না — চাইছেন নবীজির জন্য। আর এই নিঃস্বার্থ মহব্বতের বিনিময়েই নবীজি বলছেন — আমি তোমার জন্য শাফাআত করব।

দিনে পাঁচ ওয়াক্ত আজান হয়। পাঁচবার এই সুযোগ আসে। আজানের শেষে মুয়াজ্জিন যখন "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বলে থামেন, তারপর এই দোয়াটা পড়তে সময় লাগে মাত্র ত্রিশ সেকেন্ড। বছরে প্রায় এক হাজার আটশো বার এই সুযোগ আসে। আমরা কতবার কাজে লাগিয়েছি?

আজকের জীবনে এই শিক্ষা কাজে লাগানোর একটা সহজ পদক্ষেপ দিই। আজ থেকে মোবাইলে আজানের অ্যাপ বা রিমাইন্ডার চালু রাখুন। আজানের শেষে ত্রিশ সেকেন্ড থামুন — এই একটা দোয়া পড়ুন। যদি সম্পূর্ণ মুখস্থ না থাকে, আজই ফোনের নোটপ্যাডে সেভ করে রাখুন, আজানের পর দেখে দেখে পড়ুন। মুখস্থ হতে সময় লাগবে না — তিন-চার দিনেই হয়ে যাবে। আর এই একটা অভ্যাস যদি জীবনভর ধরে রাখতে পারেন, তাহলে কিয়ামতের দিন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আপনার পাশে থাকবেন স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

দৈনন্দিন এই ছোট ছোট আমলগুলো কীভাবে আখিরাতের বিশাল পুরস্কারের দরজা খুলে দেয়, আর কীভাবে প্রতিটা দিনকে একটা সম্পূর্ণ আখিরাতমুখী কর্মসূচিতে সাজানো যায় — এই গভীর শিক্ষা শায়খ উসামা আল-শুরাফা আখিরাতের ম্যানুয়ালের নবম অধ্যায়ে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। এই অধ্যায়টা পড়ার পর প্রতিটা আজান নতুন অর্থ নিয়ে কানে আসবে।

বইটির নাম: আখিরাতের ম্যানুয়াল — প্রত্যেক মুসলিমের সুখময় আখিরাতের পথনির্দেশিকা

অর্ডার করতে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করুন: 01984-563362

লিখুন: "আখিরাতের ম্যানুয়াল বই চাই"

আজ পাঁচ ওয়াক্ত আজানের পর এই দোয়াটা পড়বেন বলে মনে মনে সংকল্প করুন। সন্ধ্যায় কমেন্টে লিখুন — "আলহামদুলিল্লাহ, আজ পড়েছি।" আপনার একটা কমেন্ট হয়তো অন্য কাউকেও এই অভ্যাসটা শুরু করতে অনুপ্রাণিত করবে।



 

বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভেঙে পড়ার মুহূর্তে আল্লাহর সান্ত্বনা: কুরআনের আলোয় মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা

আসসালামু আলাইকুম


মারিয়াম (আ.)-এর কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর নির্দেশ থেকে শিখুন কীভাবে দুঃখের সময়ে শরীর ও মনের যত্ন নিতে হয়। কুরআনের চমক সিরিজের প্রথম পর্ব।
(আমার জন্ম ১৯৯২ সালে - জীবিত থাকলে দ্বীনের পথে অটল থাকার আর না থাকলে কবরের আযাব থেকে রক্ষার আমার জন্য দোয়া করবেন) 


​জীবনে চরম ভাঙন ও কঠিন পরিস্থিতিতে মারিয়াম (আ.) একা কীভাবে সান্ত্বনা পেয়েছিলেন এবং আল্লাহ তায়ালা তাঁকে শারীরিক ও মানসিক যত্নের যে শিক্ষা দিয়েছেন, তা নিয়েই কুরআনের চমক সিরিজের এই প্রথম পর্ব। দুঃখের সময়ে শুধু 'সবর করো' নয়, বরং নিজের যত্ন নেওয়ার বাস্তব শিক্ষা দেওয়া হয়েছে এখানে।



​মারিয়াম (আ.) সেদিন একা ছিলেন।
​কোনো মা নেই, কোনো সঙ্গী নেই। প্রসব বেদনায় কাতর হয়ে খেজুর গাছের গোড়ায় বসে বললেন — "হায়! আমি যদি এর আগেই মরে যেতাম।" এটি শুধু শারীরিক কষ্ট ছিল না। এটি ছিল এমন এক মানসিক ভাঙন, যার তলা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না।
​আপনি কি কখনো এতটা ভেঙে পড়েছেন যে মনে হয়েছে — আর থাকতে চাই না? মারিয়াম (আ.) সেই অনুভূতি জানতেন।
​সেই মুহূর্তে আল্লাহ কী বললেন? শুধু "সবর করো"? না। বললেন —
​فَكُلِي وَاشْرَبِي وَقَرِّي عَيْنًا
​"খাও, পান করো, এবং তোমার চোখ শীতল করো।"
[সূরা মারিয়াম: ২৬]
​এই আয়াতটি পড়ে আমি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে ছিলাম।
​কারণ আমরা যখন ভেঙে পড়ি, নিজেকে শাস্তি দিই। না খেয়ে থাকি। না ঘুমিয়ে থাকি। নিজেকে দোষারোপ করতে করতে আরো গভীরে ডুবে যাই। অথচ আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে থাকা একজন মাকে বললেন — খাও, পানি পান করো, মনকে শান্ত হতে দাও।
​"قَرِّي عَيْنًا"
​— শুধু চোখ ঠান্ডা করা নয়। আরবিতে এই কথার অর্থ হলো হৃদয়কে স্থির হতে দাও, ভেতরে শান্তি খোঁজো। আল্লাহ জানতেন কিছুক্ষণ পরেই মারিয়াম (আ.) সমাজের সামনে দাঁড়াতে হবে, কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। তাই আগে চাইলেন — শরীর শক্তিশালী থাকুক, মন প্রস্তুত থাকুক।
​যখন ব্যর্থতা আসে, সম্পর্ক ভাঙে, প্রিয়জন হারান — মানুষ বলে "সবর করো।" কথাটি সত্যি, এবং সবর করা জরুরি। কিন্তু আল্লাহ মারিয়াম (আ.)-কে যা বলেছিলেন, সেই কথাও আপনার জন্য বলা।
​ঠিকমতো খান।
​পানি পান করুন।
​ঘুমান।
​কাঁদুন — কান্না দুর্বলতা নয়, এটি ভেতরের ময়লা পরিষ্কার হওয়ার পথ।
​যিকির করুন।
​বিশ্রাম নিন।
​আল্লাহ আপনার দুঃখ দেখছেন। তিনি শুধু "সহ্য করো" বলেন না — তিনি বলেন, নিজেকে ধরে রাখো, আমি তোমার পাশে আছি।
​اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْعَفْوَ وَالْعَافِيَةَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
​"হে আল্লাহ, আমি তোমার কাছে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষমা এবং সুস্থতা চাই।"
[সুনান আবু দাউদ: ৫০৭৪]
​আল্লাহ শূন্য মরুভূমিতে একা এক মায়ের জন্য তাজা খেজুর পাঠিয়েছিলেন।
​আপনার জন্যও পাঠাবেন — যখন আপনি নিজেকে ধরে রাখবেন।
​কুরআনের চমক সিরিজ — পর্ব ১
-© ইকরাম হোসাইন (সংগ্রহীত) 
​পরের পর্বে আসছে — সংখ্যার ভেতরে আল্লাহর অবাক করা নিদর্শন। সিরিজটি মিস না করতে ফলো করুন।
​─────────────────────
​তথ্যসূত্র
​আয়াত: সূরা মারিয়াম, আয়াত ২৩-২৬।
​দোয়া: সুনান আবু দাউদ (৫০৭৪) এবং সহিহ বুখারি (৬৩৬৯)।
​মানসিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক যত্নের প্রাসঙ্গিক বিষয়সমূহ মনোবিজ্ঞানী Elisabeth Kübler-Ross এবং Harvard Medical School-এর গবেষণার আলোকে সংশ্লিষ্ট।



কুরআনের চমক, মারিয়াম আ, মানসিক শান্তি, ইসলামে মানসিক স্বাস্থ্য, সূরা মারিয়াম ২৬, ইকাম হোসাইন, Islamic motivation in Bengali
​সংক্ষিপ্ত বিবরণ

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রতিটা নেক কাজের বিনিময়ে আল্লাহ দেন কমপক্ষে দশটা পুরস্কার — কিন্তু পাপের শাস্তি মাত্র একটা।

আসসালামু আলাইকুম



প্রতিটা নেক কাজের বিনিময়ে আল্লাহ দেন কমপক্ষে দশটা পুরস্কার — কিন্তু পাপের শাস্তি মাত্র একটা

পৃথিবীর কোনো ব্যাংকে এরকম হিসাব হয় না। আপনি এক হাজার টাকা জমা দিলে এক হাজারই থাকে — দশ হাজার হয় না। আপনি পাঁচশ টাকা তুললে পাঁচশই কাটে — একশ কাটে না। কিন্তু আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর হিসাব সম্পূর্ণ আলাদা। এই হিসাবটা কুরআনে লেখা আছে, আর এটা জানার পর মানুষের জীবন দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।
(আমার জন্ম ১৯৯২ সালে - থাকলে দ্বীনের পথে অটল থাকার না থাকলে কবরের আযাব থেকে রক্ষার জন্য দোয়া করবেন
আয়াতটা দেখুন —

مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ عَشْرُ أَمْثَالِهَا ۖ وَمَن جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ

উচ্চারণ: মান জাআ বিল হাসানাতি ফালাহু আশরু আমসালিহা, ওয়া মান জাআ বিস সাইয়্যিআতি ফালা ইউজযা ইল্লা মিসলাহা ওয়া হুম লা ইউজলামুন।

অর্থ: যে একটি নেক কাজ নিয়ে আসবে, তার জন্য রয়েছে তার দশগুণ পুরস্কার। আর যে একটি মন্দ কাজ নিয়ে আসবে, তাকে শুধু সেটার সমপরিমাণ শাস্তি দেওয়া হবে। আর তাদের প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না। (সূরা আনআম, আয়াত ১৬০)




দুইটা সংখ্যা — দশ এবং এক। এই দুইটা সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে আছে আল্লাহর রহমতের অসাধারণ এক গণিত।

প্রথম দিকটা দেখুন — "মান জাআ বিল হাসানাতি ফালাহু আশরু আমসালিহা," যে একটি নেক কাজ নিয়ে আসবে, তার জন্য দশগুণ পুরস্কার। "কমপক্ষে দশ" — কারণ অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, এই সংখ্যা সাতশো গুণ পর্যন্তও যেতে পারে, আর আল্লাহ চাইলে তারও বেশি। "আশরু আমসালিহা" — দশগুণ এটা মিনিমাম, সর্বনিম্ন গ্যারান্টি। আল্লাহ সর্বনিম্ন যা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেটাও সাধারণ হিসাবের দশগুণ।

শায়খ উসামা আল-শুরাফা আখিরাতের ম্যানুয়ালের দ্বিতীয় অধ্যায় "সফলতার সংজ্ঞা"-তে এই আয়াতটাকে বিশ্লেষণ করেছেন এমনভাবে, যা সফলতার পুরো সংজ্ঞাটাই বদলে দেয়। তিনি দেখিয়েছেন — দুনিয়ার হিসাবে সফলতা মানে বেশি বিনিয়োগ করে বেশি আয়। কিন্তু আল্লাহর হিসাবে সফলতার শুরুটাই দশগুণ দিয়ে, শেষটা কোথায় সেটা আল্লাহর ইচ্ছার ওপর।

এবার দ্বিতীয় দিকটা দেখুন — "ওয়া মান জাআ বিস সাইয়্যিআতি ফালা ইউজযা ইল্লা মিসলাহা," যে একটি মন্দ কাজ নিয়ে আসবে, তাকে শুধু সেটার সমপরিমাণ শাস্তি। "মিসলাহা" — সমপরিমাণ, একটার বিপরীতে একটা। একটা পাপ করলে একটা শাস্তি। এতটুকুই। বাড়তি একটাও নয়।

এই দুইটা পাশাপাশি রাখলে আল্লাহর রহমতের বিশালতাটা বোঝা যায়। একটা নেক কাজ — দশটা পুরস্কার। একটা পাপ — একটা শাস্তি। এই হিসাবে যদি কেউ সারাজীবন দুটো নেক কাজ করে একটা পাপ করেন, তার পাল্লায় পুরস্কার থাকবে বিশটা, শাস্তি থাকবে একটা। নেট ফলাফল — ঊনিশটা পুরস্কার।

আয়াতের শেষে আল্লাহ যোগ করেছেন — "ওয়া হুম লা ইউজলামুন," আর তাদের প্রতি কোনো অবিচার করা হবে না। এই শেষের কথাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কেউ হয়তো ভাবতে পারে — দশগুণ পুরস্কার দেওয়া মানে তো পাপীদের জন্য অবিচার, কারণ নেককার তো বেশি পেয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ স্পষ্ট করে দিলেন — এটা অবিচার নয়, এটা অনুগ্রহ। অনুগ্রহ করা আর অবিচার করা দুটো ভিন্ন জিনিস।

এই আয়াতটা আরেকটা কারণে গুরুত্বপূর্ণ — এটা হতাশার ওষুধ। অনেক মানুষ ভাবেন, গুনাহের পাহাড় এত বড় হয়ে গেছে যে নেক কাজ দিয়ে আর পোষানো যাবে না। কিন্তু আল্লাহর এই হিসাবটা মাথায় রাখলে বোঝা যায় — প্রতিটা নেক কাজ দশটা গুনাহের বোঝা হালকা করার ক্ষমতা রাখে। হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই — প্রতিটা মুহূর্ত নতুন শুরুর সুযোগ।

আজকের জীবনে এই শিক্ষা কাজে লাগানোর একটা সহজ অনুশীলন দিই। আজ থেকে ছোট নেক কাজগুলোকে তুচ্ছ মনে করা বন্ধ করুন। একটা সালামের জবাব দিলেন — সেটা দশটা পুরস্কার। কাউকে হাসি দিয়ে স্বাগত জানালেন — দশটা পুরস্কার। ছোট্ট একটা সদকা করলেন — দশটা পুরস্কার। এই হিসাবে একটা সাধারণ দিনেও শত শত পুরস্কার জমানো সম্ভব। দুনিয়ার কোনো বিনিয়োগ এই রিটার্ন দিতে পারে না।

আল্লাহর হিসাবের এই অসাধারণ সমীকরণ, রহমত আর ন্যায়বিচারের এই অনন্য ভারসাম্য, আর কীভাবে প্রতিটা ছোট আমলকেও বিশাল সুযোগে পরিণত করা যায় — এই গভীর শিক্ষা শায়খ উসামা আল-শুরাফা আখিরাতের ম্যানুয়ালের দ্বিতীয় অধ্যায়ে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন।

বইটির নাম: আখিরাতের ম্যানুয়াল — প্রত্যেক মুসলিমের সুখময় আখিরাতের পথনির্দেশিকা

অর্ডার করতে হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করুন: 01984-563362

লিখুন: "আখিরাতের ম্যানুয়াল বই চাই"

এবার একটা সহজ অঙ্ক করুন — আজ সারাদিনে আপনি আনুমানিক কয়টা নেক কাজ করেছেন? সেটাকে দশ দিয়ে গুণ করুন। এটাই আজকের পুরস্কারের সর্বনিম্ন হিসাব। কমেন্টে সংখ্যাটা লিখুন।

সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

কেন এই সূরা?

আসসালামু আলাইকুম 

প্রতি জুমায় সূরা কাহফ পড়েন। অনেকেই পড়েন। কিন্তু একটু থামুন — কেন এই সূরা? কেন শুধু জুমার দিন? কেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই একটি সূরাকে এত গুরুত্ব দিয়েছেন?




এর পেছনে একটি গভীর কারণ আছে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন —

مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ مِنَ النُّورِ مَا بَيْنَ الْجُمُعَتَيْنِ

মান কারাআ সুরাতাল কাহফি ফি ইয়াওমিল জুমুআতি আদ্বাআ লাহু মিনান নুরি মা বাইনাল জুমুআতাইন।

অর্থ: যে ব্যক্তি জুমার দিন সূরা কাহফ পড়বে, তার জন্য দুই জুমার মাঝের পুরো সময়টা নূরে আলোকিত হয়ে যাবে।
[মুস্তাদরাক হাকিম, সহিহ]

এই নূর শুধু আলোর কথা বলছে না। এই নূর হলো ঈমানের সেই দৃষ্টিশক্তি যা দিয়ে মানুষ দুনিয়ার আসল চেহারা দেখতে পায়। এবার মূল প্রশ্নে আসি — কেন এই সূরা দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা করে? কারণ এই সূরায় চারটি ঘটনা আছে। আর এই চারটি ঘটনাই আসলে চারটি পরীক্ষা — যে পরীক্ষা দাজ্জাল নিয়ে আসবে।

প্রথম ঘটনা — গুহার মানুষ। ঈমানের পরীক্ষা।

কয়েকজন তরুণ সত্যের পথে অটল থাকার জন্য সমাজ, পরিবার, রাজার ক্ষমতা — সবকিছু ছেড়ে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা জানতেন না কতদিন থাকতে হবে, কী হবে। শুধু জানতেন — ঈমান ছাড়তে পারবেন না। আল্লাহ তাদের ৩০৯ বছর ঘুম পাড়িয়ে রেখে জাগালেন — এবং তাদের ঘটনাকে কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য শিক্ষা বানিয়ে দিলেন। আজকের যুগে এই পরীক্ষা আসছে ভিন্ন রূপে — চারদিকে যখন সবাই আপোষ করছে, আপনি কি ঈমানে অটল থাকতে পারবেন?

দ্বিতীয় ঘটনা — দুই বাগানের মালিক। সম্পদের পরীক্ষা।

একজনের দুটি বিশাল বাগান ছিল। ফসল ফলছে, নদী বইছে, জীবন সুন্দর। ধীরে ধীরে সম্পদের অহংকার তার অন্তরে ঢুকে গেল — "এই বাগান কোনোদিন শেষ হবে না, কিয়ামতও আসবে না।" তার বিশ্বাসী বন্ধু সাবধান করলেন, কিন্তু সে শুনল না। এরপর আল্লাহ এক রাতেই সব নিয়ে নিলেন। সকালে সে দেখল — শুধু জমিন বাকি, সব শেষ। আজকের যুগে এই পরীক্ষা আসছে হারাম উপার্জনের সুযোগ হিসেবে, সম্পদের মোহ হিসেবে।

তৃতীয় ঘটনা — মুসা আলাইহিস সালাম ও খিজির। জ্ঞানের পরীক্ষা।

মুসা আলাইহিস সালাম — যিনি নবী, যাঁর কাছে ওহি আসে — তিনিও জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে খিজিরের কাছে শিখতে গেলেন। পথে তিনবার তিনি ধৈর্য হারালেন — কারণ তিনি দেখছিলেন বাইরের ঘটনা, কিন্তু পেছনের হিকমত দেখতে পাচ্ছিলেন না। এই ঘটনা আমাদের বলছে — মানুষের জ্ঞান সীমিত, আল্লাহর পরিকল্পনা অসীম। আজকের যুগে এই পরীক্ষা আসছে ইউটিউব-পডকাস্টের বিভ্রান্তিকর কন্টেন্ট হিসেবে।

চতুর্থ ঘটনা — যুলকারনাইন। ক্ষমতার পরীক্ষা।

একজন শক্তিশালী বাদশা যাকে আল্লাহ পৃথিবীর পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত ক্ষমতা দিয়েছিলেন। কিন্তু এই ক্ষমতা তাকে অহংকারী করেনি। দুর্বল জাতিকে বাঁচাতে প্রাচীর বানালেন — কোনো বিনিময় ছাড়া। বললেন — "এটা আমার রবের রহমত।" আজকের যুগে এই পরীক্ষা আসছে নাফসের অহংকার হিসেবে, পদ ও পরিচিতির মোহ হিসেবে।

এই চারটি পরীক্ষাই দাজ্জাল নিয়ে আসবে। আর সূরা কাহফ এই চারটির বিরুদ্ধে চারটি ঢাল তৈরি করে। এই কারণেই জুমার দিন এই সূরা।

শায়খ উসামা আল-শুরাফা "আখিরাতের ম্যানুয়াল"-এ এই চারটি ফিতনার আধুনিক রূপ এত স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে পড়তে পড়তে নিজের জীবন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। যিনি বুঝতে চান — দাজ্জালের ফিতনা আসলে কতটা কাছে এসে গেছে, এবং সূরা কাহফ সেই ফিতনা থেকে কীভাবে রক্ষা করে — তাঁর জন্য এই বই।

আজকের জুমায় সূরা কাহফ পড়ুন — শুধু পাঠ নয়, অর্থ বুঝে। আর বইটি নিতে WhatsApp করুন।

WhatsApp: 01984-563362
লিখুন: "আখিরাতের ম্যানুয়াল চাই"

আজকের জুমায় সূরা কাহফ পড়বেন?

কমেন্টে জানান।

/EKRAMHOSSAIN ভাইকে চিনি নিজ দায়িত্বে বই সংগ্রহ করুন।

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

আপনি এখনো মায়ের পেটেই আছেন—সূরা নাহলের এক অবিশ্বাস্য চিত্রকল্প

আসসালামু আলাইকুম



আপনি এখনো মায়ের পেটেই আছেন—সূরা নাহলের এক অবিশ্বাস্য চিত্রকল্প

আসুন, আজ সূরা আন-নাহলের এমন কিছু আয়াত নিয়ে ভাবি, যেগুলো প্রথম দেখায় মনে হবে ছড়ানো-ছিটানো কিছু বিষয়ের তালিকা—মায়ের গর্ভ, পাখি, ঘরবাড়ি, তাবু, ছায়া, গুহা, পোশাক, বর্ম। কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই দেখবেন, আয়াতগুলো একের পর এক গেঁথে তুলেছে এক অসাধারণ চিত্রকল্প—যা একবার বুঝে ফেললে পাখির দিকে তাকানোর দৃষ্টিও বদলে যাবে।

অনুচ্ছেদটা শুরু হয়েছে এভাবে:
وَاللَّهُ أَخْرَجَكُمْ مِنْ بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا
"আল্লাহ তোমাদের বের করে এনেছেন তোমাদের মায়েদের পেট থেকে, যখন তোমরা কিছুই জানতে না" 

وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
"আর তিনি তোমাদের দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং হৃদয়—যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হতে পারো।" (১৬:৭৮)

ক্রমটা লক্ষ্য করেছেন? প্রথমে শ্রবণ, তারপর দৃষ্টি, তারপর হৃদয়। এটা কোনো এলোমেলো তালিকা নয়। আপনি যখন কিছু শোনেন, তা বদলে দেয় আপনার দেখার দৃষ্টিভঙ্গি; আর নতুন দৃষ্টিতে যা দেখেন, তা স্পর্শ করে আপনার হৃদয়কে। আল্লাহর কালাম শুনুন—আপনার চোখ জগৎটাকে নতুনভাবে দেখতে শিখবে—আর প্রতিবার সেই দেখা আপনার অন্তরে রেখে যাবে কৃতজ্ঞতার ছাপ। সামনের আয়াতগুলো ঠিক এই প্রক্রিয়াটারই হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ।

এবার ভাবুন। মায়ের গর্ভে আপনি কেমন ছিলেন? পরম প্রশান্তিতে আবৃত—খাবারের চিন্তা নেই, নিরাপত্তার ভয় নেই। আল্লাহ নিজে আপনাকে সেখানে জড়িয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই সময়ের কথা কি আপনার মনে আছে? না। তাহলে সেই তত্ত্বাবধান অনুভব করবেন কীভাবে?
ঠিক পরের আয়াতেই আল্লাহ বললেন:

أَلَمْ يَرَوْا إِلَى الطَّيْرِ مُسَخَّرَاتٍ فِي جَوِّ السَّمَاءِ مَا يُمْسِكُهُنَّ إِلَّا اللَّهُ
"তারা কি পাখির দিকে তাকায় না, যারা ঝুলে আছে আকাশের পেটের মাঝখানে? আল্লাহ ছাড়া কেউ তাদের ধরে রাখেনি!" (১৬:৭৯)

সুবহানাল্লাহ! ভাষাটা দেখুন—আকাশের "জাও", আকাশের পেট! যেমন আল্লাহ ছাড়া কেউ আপনাকে আপনার মায়ের গর্ভে ধরে রাখেনি, তেমনি আল্লাহ ছাড়া কেউ ওই পাখিকে শূন্যে ধরে রাখছে না। পাখির পৃথিবী হলো আকাশ, আর আপনার প্রথম পৃথিবী ছিল মায়ের গর্ভ। এরপর যখনই আকাশে পাখি দেখবেন, মনে করবেন—আমিও একদিন ঠিক ওভাবেই ভেসে ছিলাম, আল্লাহর করুণার মধ্যে। একটা সাধারণ পাখিও তখন হয়ে উঠবে আপনার ঈমান বাড়ানোর উপলক্ষ।
তারপর? মায়ের আবরণ থেকে বের করে এনে আল্লাহ কি আপনাকে খোলা আকাশের নিচে ছেড়ে দিলেন? না। তিনি দিলেন নতুন আবরণ:

وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمْ مِنْ بُيُوتِكُمْ سَكَنًا
"আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলোকে বানিয়েছেন প্রশান্তির স্থান।"

মা ছিলেন আপনার প্রথম ঘর; এখন ঘরটাই যেন আপনার নতুন মা। গর্ভে ছিল সুকুন, এখন ঘরে আছে সাকান। কিন্তু ঘর ছেড়ে সফরে বের হলে? তার জন্য পশুর চামড়ার তাবু—হালকা, বহনযোগ্য আবরণ:

وَجَعَلَ لَكُمْ مِنْ جُلُودِ الْأَنْعَامِ بُيُوتًا تَسْتَخِفُّونَهَا يَوْمَ ظَعْنِكُمْ وَيَوْمَ إِقَامَتِكُمْ
"আর পশুর চামড়া থেকে তিনি তোমাদের জন্য বানিয়েছেন এমন ঘর, যা তোমরা সহজে বহন করো—চলার দিনেও, থামার দিনেও।" 

তাবুও যদি না থাকে?
وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمْ مِمَّا خَلَقَ ظِلَالًا
"আর আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি থেকেই তোমাদের জন্য করেছেন ছায়ার ব্যবস্থা।"

রুক্ষ পাহাড়ি প্রান্তরে ঝড় এলে?
وَجَعَلَ لَكُمْ مِنَ الْجِبَالِ أَكْنَانًا
"আর পর্বতের মধ্যে তিনি তোমাদের জন্য বানিয়েছেন আশ্রয়ের গুহা।" 

আর যখন কোনো ছায়া নেই, গুহা নেই? তখনও আপনি আবরণহীন নন:

وَجَعَلَ لَكُمْ سَرَابِيلَ تَقِيكُمُ الْحَرَّ وَسَرَابِيلَ تَقِيكُمْ بَأْسَكُمْ
"আর তিনি তোমাদের জন্য বানিয়েছেন পোশাক, যা তোমাদের তীব্র গরম থেকে রক্ষা করে; আর এমন পোশাকও (বর্ম), যা তোমাদের যুদ্ধে রক্ষা করে।"

লক্ষ্য করুন, একটার পর একটা, একটার পর একটা—প্রতিটি দৃশ্যে একই বার্তা: আপনি কখনোই আবরণের বাইরে নন। আমরা ভাবি, মায়ের পেটে আমরা কত অসহায় ছিলাম, আল্লাহই সব ব্যবস্থা করতেন। আর আল্লাহ মনে করিয়ে দিচ্ছেন—তোমরা তো এখনো তা-ই আছো! এই মুহূর্তেও আপনি পোশাকের ভেতরে আছেন, ছাদের নিচে আছেন, ছায়ার মধ্যে আছেন। পাখিটা যেমন এখনো আকাশের পেটেই ভেসে আছে, আপনিও এখনো আল্লাহর কোনো না কোনো রহমতের আবরণের ভেতরেই আছেন। আয়াতের শুরুতে যে বলা হয়েছিল "তোমরা কিছুই জানো না"—এই না-জানাটা শুধু শৈশবের কথা নয়; আমরা আজও জানি না, প্রতি মুহূর্তে কত আবরণে তিনি আমাদের জড়িয়ে রেখেছেন।

আর এই অনুচ্ছেদ শেষ হয়েছে কী দিয়ে?
كَذَلِكَ يُتِمُّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تُسْلِمُونَ
"এভাবেই তিনি তাঁর নিয়ামত তোমাদের উপর পূর্ণ করেন, যাতে তোমরা আত্মসমর্পণ করো।"

শুরুতে ছিল "লাআল্লাকুম তাশকুরুন"—যাতে কৃতজ্ঞ হও; শেষে "লাআল্লাকুম তুসলিমুন"—যাতে সমর্পিত হও। কৃতজ্ঞতা থেকে আত্মসমর্পণ—এটাই যাত্রা।
শেষে একটা কথা, যা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। কুরআনের অন্য এক জায়গায় আল্লাহ কিয়ামতের দিনের বর্ণনায় বলেছেন:

وَتَرَكْتُمْ مَا خَوَّلْنَاكُمْ
"আর তোমরা ফেলে এসেছো সেই সবকিছু, যা আমি তোমাদের দিয়েছিলাম।" (৬:৯৪ - সূরা আল-আন'আম)

সেদিন সব আবরণ খুলে যাবে—ঘর নেই, পোশাকের মর্যাদা নেই, ছায়া নেই। যিনি সারাজীবন এত আবরণে ঢেকে রাখলেন, সেদিন একটাই আবরণ কাজে আসবে—তাকওয়ার আবরণ, আমলের আবরণ।
আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা আমাদের তাঁর অগণিত আবরণের নিয়ামত উপলব্ধি করার, কৃতজ্ঞ হওয়ার এবং পূর্ণ আত্মসমর্পণের তৌফিক দান করুন।

—নোমান আলী খান
— সূরা আন-নাহলের চিত্রকল্পের ক্রম-অগ্রগতি বিষয়ক লেকচার থেকে
— বায়্যিনাহ

শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

"বিচারের দিনের প্রমাণ কী?" -- --- প্রমাণটি তোমার ভেতরেই লুকিয়ে আছে।"

আসসালামু আলাইকুম


 
"বিচারের দিনের প্রমাণ কী?" -- --- প্রমাণটি তোমার ভেতরেই লুকিয়ে আছে।"




আল্লাহ প্রতিটি প্রাণীকে 'ইন্সটিঙ্কট' বা সহজাত প্রবৃত্তি দিয়েছেন, যেন সে এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে (সার্ভাইভ করতে) পারে। তাই একটি সিংহ হরিণ শিকারের আগে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকে, যেন হরিণটি পালিয়ে না যায়। এটি একটি সচেতন প্রচেষ্টা (conscious act)। পাখি যখন বাসা তৈরি করে কিংবা ডিম রক্ষা করে, সেগুলোও সচেতন প্রচেষ্টা। প্রতিটি জীবই এভাবে নিজের প্রবৃত্তি অনুযায়ী জীবন রক্ষার জন্য নানাবিধ সচেতন কাজ করে থাকে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো—সার্ভাইভাল বা টিকে থাকা।

এবার যদি আমরা এক পা পিছিয়ে জড়বস্তুর দিকে তাকাই, তবে দেখব সেগুলোরও একটি নির্দিষ্ট কার্যকরী উদ্দেশ্য (functional purpose) আছে। ধাতুর উদ্দেশ্য আছে, কাঠের উদ্দেশ্য আছে, আগুনেরও নির্দিষ্ট কাজ আছে। অর্থাৎ, নিম্নস্তরে জড়বস্তুর আছে কার্যকরী উদ্দেশ্য, আর জীবজগতের উদ্দেশ্য হলো জীবনের সংরক্ষণ (preservation of life)।

কিন্তু মানুষের বেলায় কী ঘটে? মানুষকে এমন কিছু দেওয়া হয়েছে যা সৃষ্টিজগতের অন্য কাউকেই দেওয়া হয়নি; আর তা হলো—'রূহ'। এই রূহের রয়েছে আরও উচ্চতর আদর্শ (higher ideals)—যেমন ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা, সাম্য, ভালোবাসা, কল্যাণ এবং সত্য।

বিশ্বজগতের সবকিছুরই যদি কোনো না কোনো উদ্দেশ্য থেকে থাকে, তবে আমাদের এই রূহেরও নিশ্চয়ই একটি মহৎ উদ্দেশ্য আছে। আমাদের কেন ভালো-মন্দের জ্ঞান দেওয়া হলো? কেন দেওয়া হলো ন্যায়বিচারের বোধ? কেন আমাদের ভেতরে দানশীলতা, দয়া, সহমর্মিতা বা করুণার মতো উচ্চতর অনুভূতিগুলো গেঁথে দেওয়া হলো?

এগুলোর অবশ্যই আরও উচ্চতর কোনো উদ্দেশ্য থাকতে হবে। সমস্যা হলো, মানুষের আগের স্তরের যত চেতনা (consciousness) আছে, তার সবই এই পার্থিব জগৎকেন্দ্রিক। তাই সেগুলোর উদ্দেশ্য এই দুনিয়াতেই পূরণ হয়ে যায়। কিন্তু রূহ তো এই দুনিয়ার কোনো উপাদান নয়; তাই এর উদ্দেশ্যও এই দুনিয়ায় সীমাবদ্ধ হতে পারে না।

আমাদের এই উচ্চতর বিবেক বা চেতনা দেওয়া হয়েছে যেন আমরা শুধু এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াতেই নয়, বরং শেষ বিচারের দিনেও সফল হতে (সার্ভাইভ করতে) পারি। আর ঠিক এই কারণেই, প্রতিবার যখনই আমরা আমাদের সেই বিবেককে লঙ্ঘন করি, রূহের পবিত্রতা নষ্ট করি, তখনই আমাদের ভেতরে একটা তীব্র অপরাধবোধ বা খারাপ লাগা কাজ করে। আমাদের এই খারাপ লাগার অনুভূতিটা যেন ভেতর থেকে চিৎকার করে বলতে থাকে—"এই যে! তুমি কি ভুলে গেছ যে তোমার সামনে এক মহা বিচারের দিন আসছে?"

মানুষের অন্তরে আল্লাহ একটি নৈতিক অ্যালার্ম সিস্টেম সেট করে দিয়েছেন, যাকে বলা হয় 'গিল্টি কনসেন্স' (guilty conscience) বা অনুতপ্ত বিবেক। এটি মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে তাকে আরও উন্নত উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর সেই উদ্দেশ্যটি কী? শেষ বিচারের দিন।

ঠিক এখান থেকেই আমরা বুঝতে পারি, কেন আল্লাহ সূরা কিয়ামাহ-র শুরুতে এই দুটি বিষয়ের মধ্যে একটি গভীর সংযোগ তৈরি করেছেন: "লা উকসিমু বিইয়াওমিল কিয়ামাহ, ওয়া লা উকসিমু বিন-নাফসিন লাউওয়ামাহ"—শপথ কিয়ামত দিবসের এবং শপথ সেই আত্মার, যা নিজেকে ধিক্কার দেয়।

কেন এই দুটি ধারণাকে আল্লাহ একসাথে জুড়লেন? এটি এক পরম বিস্ময়! আপনার ফোনের অ্যালার্ম যেমন আপনাকে কোনো কাজের কথা মনে করিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি আমাদের ভেতরের এই অপরাধবোধ বা 'গিল্ট' হলো এক আধ্যাত্মিক অ্যালার্ম, যা আমাদের শেষ বিচারের মুখোমুখি হওয়ার কথা স্মরণ করায়। আল্লাহ এটি আমাদের স্বভাবজাত প্রকৃতির (ফিতরাত) অংশ করে দিয়েছেন।

এখন কেউ যদি প্রশ্ন করে—"বিচারের দিনের প্রমাণ কী?" কুরআন অত্যন্ত গভীরভাবে তার উত্তর দেয়: "তোমার নিজের সত্তার দিকে তাকাও; প্রমাণটি তোমার ভেতরেই লুকিয়ে আছে।"

—নোমান আলী খান
— সূরা আল কিয়ামাহ ১ম পর্বের আলোচনা থেকে। 
— বায়্যিনাহ

বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬

সময়ের গুরুত্ব

আসসালামু আলাইকুম


সময়ের গুরুত্ব




সূরা আসরের ১নং আয়াতে  (সময়ের গুরুত্ব) অনুযায়ী আমাদের জীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সময়কে অপচয় না করে তার সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। যেহেতু আমাদের আয়ু অত্যন্ত সীমিত এবং পার হয়ে যাওয়া সময় আর কখনো ফিরে পাওয়া যাবে না, তাই এই ক্ষতি থেকে বাঁচতে আমরা বাস্তব জীবনে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারি:

​১. জীবনের একটি স্পষ্ট লক্ষ্য (Purpose) ঠিক করা
​আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে আল্লাহর ইবাদত এবং পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কল্যাণকর কাজ করার জন্য। তাই প্রতিদিনের কাজ শুরুর আগে নিয়ত ঠিক করা এবং এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা যা ইহকাল ও পরকাল—উভয় জগতেই কাজে আসবে।

​২. সময়ের হিসাব রাখা ও রুটিন তৈরি করা
​অগ্রাধিকার (Priority) ঠিক করা: দৈনিক কাজের একটি তালিকা করা, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো (যেমন: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, পড়াশোনা/চাকরি, পরিবারের দায়িত্ব) আগে থাকবে।
​অপ্রয়োজনীয় কাজ বাদ দেওয়া: অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, গসিপ বা আড্ডা, এবং অনুৎপাদক কাজে সময় নষ্ট করা বন্ধ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "ব্যক্তির ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য হলো নিরর্থক বিষয় ত্যাগ করা।"

​৩. প্রতিটি মুহূর্তকে 'নেক আমলে' রূপান্তর করা
​ইসলামের একটি সুন্দর দিক হলো, আপনি যদি ভালো নিয়তে সাধারণ কোনো কাজও করেন, তবে সেটিও ইবাদত বা নেক আমলে পরিণত হয়।
​রুজি-রোজগার বা পড়াশোনার সময় নিয়ত ঠিক রাখা যে, আমি হালালভাবে চলব এবং মানুষের সেবা করব।
​অবসর সময়ে বা যাতায়াতের পথে মুখে কিংবা মনে মনে আল্লাহর জিকির (যেমন: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ) করা। এতে সময় নষ্ট হওয়া থেকে বেঁচে যায়।

​৪. অলসতা ও দীর্ঘসূত্রিতা (Procrastination) পরিহার করা
​"আজকের কাজ কাল করব" —এই মানসিকতা মানুষকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ আগামীকাল আমাদের জীবনে নাও আসতে পারে। অলসতা দূর করতে নবীজি (সা.) নিয়মিত আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। তাই কোনো ভালো কাজের সুযোগ আসামাত্রই তা করে ফেলা উচিত।

​সহজ কথায়:
বরফ যেমন রেখে দিলে গলে পানি হয়ে যায়, আমাদের জীবনের সময়টাও তেমনি শেষ হয়ে যাচ্ছে। ১নং পয়েন্টের শিক্ষা অনুযায়ী আমরা অলস বসে না থেকে প্রতিটি সেকেন্ডকে ঈমান, সৎ কাজ, সত্যের প্রচার এবং ধৈর্যের পেছনে বিনিয়োগ করব—যেন মৃত্যুর পর আফসোস করতে না হয়।

তোমাদের কুফরি ও শিরকের পথ সম্পূর্ণ আলাদা, আর আমার তাওহীদের পথ সম্পূর্ণ আলাদা

আসসালামু আলাইকুম

উস্তাদ নোমান আলী খানের :

সূরা আল-কাফিরুনের পটভূমি ও নামকরণ

  • কুরাইশদের শেষ চেষ্টা: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াত যখন মক্কায় ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন কুরাইশ নেতারা তাকে থামাতে সবরকম চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। সবশেষে তারা একটি আপস বা চুক্তির প্রস্তাব নিয়ে আসে।
  • আপসের প্রস্তাব: তারা প্রস্তাব করে— "হে মুহাম্মদ, এসো আমরা একটা মাঝামঝি পথ বেছে নিই। এক বছর আমরা তোমার ইলাহ বা আল্লাহর ইবাদত করব, আর পরের বছর তুমি আমাদের উপাস্যদের (মূর্তিগুলোর) ইবাদত করবে।"
  • কঠোর জবাব: কুরাইশদের এই হাস্যকর ও আপসকামিতার প্রস্তাবের জবাবে আল্লাহ তাআলা সরাসরি এই সূরাটি নাজিল করেন, যেখানে কুরাইশদের স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয় যে, ঈমান ও কুফরের মাঝে কোনো মাঝামাঝি পথ বা আপস হতে পারে না।

আয়াতভিত্তিক বিস্তারিত আলোচনা ও ব্যাখ্যা

১. আয়াত: قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ

অর্থ: বলুন, হে কাফিরেরা (সত্য অস্বীকারকারীরা)!


  • 'ক্বুল' (বলুন)-এর তাৎপর্য: আল্লাহ রাসুল (সা.)-কে সরাসরি নির্দেশ দিচ্ছেন এই কথাটি তাদের মুখামুখি বলতে। এটি রাসুল (সা.)-এর নিজের কথা নয়, বরং আল্লাহর সরাসরি আদেশ।
  • 'ইয়া আইয়্যুহাল কাফিরুন': এখানে 'কাফির' শব্দটি মক্কার সেই নির্দিষ্ট কুরাইশ নেতাদের উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, যাদের সামনে সত্য পুরোপুরি স্পষ্ট হওয়ার পরও তারা তা অহংকারবশত অস্বীকার করেছিল। এটি সাধারণ কোনো সম্বোধন ছিল না, বরং তাদের অনমনীয় অবাধ্যতার কারণে এটি ছিল একটি চূড়ান্ত ঘোষণা।

২. আয়াত: لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ

অর্থ: আমি তার ইবাদত করি না, যার ইবাদত তোমরা করো।


  • বর্তমান ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা: ব্যাকরণগতভাবে এখানে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ উভয় সময়কে নির্দেশ করা হয়েছে। অর্থাৎ, "আমি বর্তমানেও তোমাদের মূর্তির উপাসনা করছি না এবং ভবিষ্যতেও কখনো তা করার প্রশ্নই আসে না।"

৩. আয়াত: وَلَا أَنتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ

অর্থ: এবং তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও, যাঁর ইবাদত আমি করি।


  • ইবাদতের বিশুদ্ধতা: কাফিররা দাবি করত তারাও আল্লাহর ইবাদত করে (মূর্তির পাশাপাশি)। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তা প্রত্যাখ্যান করে বলছেন যে, শিরক মিশ্রিত ইবাদত কখনোই আল্লাহর ইবাদত হিসেবে গণ্য হয় না। তাই তারা আসলে আল্লাহর প্রকৃত ইবাদতকারী নয়।

৪. আয়াত: وَلَا أَنَا عَابِدٌ مَّا عَبَدتُّمْ

অর্থ: এবং আমি ইবাদতকারী নই তার, যার ইবাদত তোমরা করে আসছ।


  • দৃঢ়তা প্রকাশ: দ্বিতীয়বার এই কথাটি বলার মাধ্যমে রাসুল (সা.)-এর অবস্থানের দৃঢ়তা প্রকাশ করা হয়েছে। কাফিররা যেন কোনো অবস্থাতেই বা ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপের কারণেও নবীজি (সা.) তাদের দেব-দেবীর প্রতি সামান্যতমও ঝুঁকবেন— এমন আশা যেন না করে।

৫. আয়াত: وَلَا أَنتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ

অর্থ: এবং তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও, যাঁর ইবাদত আমি করি।


  • ভবিষ্যদ্বাণী ও অবসান: এই আয়াতটি আবার পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা হয়েছে যে, ওই নির্দিষ্ট কাফির নেতারা তাদের অহংকারের কারণে কখনোই আন্তরিকভাবে আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে নেবে না এবং তাদের এই কুফরি আচরণের কোনো পরিবর্তন হবে না।

৬. আয়াত: لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ

অর্থ: তোমাদের জন্য তোমাদের দীন (ধর্ম/জীবনব্যবস্থা), আর আমার জন্য আমার দীন।


  • চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতা: এটি কোনো ধর্মীয় সহনশীলতা বা 'যার যার ধর্ম তার তার'— এমন সাধারণ উদারতার কথা বলা হচ্ছে না। বরং এটি মূলত একটি চূড়ান্ত সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা।
  • আপসের সমাপ্তি: এর অর্থ হলো— "তোমাদের কুফরি ও শিরকের পথ সম্পূর্ণ আলাদা, আর আমার তাওহীদের পথ সম্পূর্ণ আলাদা। এই দুই পথের মাঝে কোনো সমন্বয় বা আপস সম্ভব নয়।"

দারসের মূল শিক্ষা ও সারসংক্ষেপ

​উস্তাদ নোমান আলী খান এই দারসের শেষে জোর দিয়ে বলেন যে, ইসলাম ও কুফরের মৌলিক বিশ্বাসের জায়গাগুলোতে কখনোই আপস করা যাবে না। সমাজে শান্তিতে বসবাস করা এবং একে অপরের অধিকার রক্ষা করা এক জিনিস, কিন্তু দ্বীনের মূল আকীদা বা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কাফিরদের সন্তুষ্ট করার জন্য ইসলামকে পরিবর্তন বা নরম করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই সূরাটি মুসলিমদেরকে তাদের বিশ্বাসের ওপর অটল ও অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়।

আপনার সুবিধার্থে সম্পূর্ণ ভিডিওটি দেখতে এবং উস্তাদের চমৎকার বাচনভঙ্গিতে দারসটি শুনতে NAK In Bangla চ্যানেলের মূল ভিডিওটি এখানে দেখতে পারেন

 


https://youtu.be/I9v0LjKZbhU?si=LzpwsbreMjWrAVdn
আসসালামু আলাইকুম


মাদ্রাসাগুলোতে, ইসলামিক ইন্সটিটিউশনগুলোতে কুরআন ছাড়া সকল বিষয় পড়ানো হয়। তাদের ফিকহ পড়ানো হয়, আকিদা পড়ানো হয়, সিরাত পড়ানো হয়, কালাম পড়ানো হয়, মান্তেক পড়ানো হয়, সবই পড়ানো হয়। কিন্তু জানেন কোন সাবজেক্টটা ভালো করে, গভীরভাবে পড়ানো হয় না? কুরআন। আমি পাকিস্তান গিয়েছি, ইন্দোনেশিয়াতে গিয়েছি বিভিন্ন মুসলিম দেশে গিয়েছি। আল্লাহর শপথ! আমি বিভিন্ন মাদ্রাসায় গিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছি—'আপনাদের এখানে কুরআনের ওপর স্পেশালাইজেশন (উচ্চতর গবেষণা) কোথায়?' তারা উত্তর দিয়েছে—'ওহ! আমাদের তো তেমন কোনো বিভাগ নেই। আমরা কয়েক বছর ফিকহ পড়াই, কয়েক বছর আকিদা পড়াই...'। আচ্ছা, কিন্তু কুরআন কত বছর পড়ান? হ্যাঁ, আমরা তাফসীর পড়াই। আমি বললাম, সেটা তো কুরআন না। আমি বলছি কুরআন। হ্যাঁ, ঐটা হয়তো একটা তাফসীর। কিন্তু কুরআন তো বিশাল এক লাইব্রেরি। কুরআন স্টাডি কোথায়? আমরা এটা এভাবে পড়াই না। পরে, আমি ড. আকরাম নদভিকে জিজ্ঞেস করলাম, ড. সাহেব! বিশ্বের কোথায় কুরআন পড়ানো হয়? তিনি বললেন, আমার মাথায় কোনো স্থানের কথা আসছে না। মরক্কো এবং সুদানের কোনো কোনো স্থানে কিছু প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু সাধারণভাবে বলতে গেলে, না। কোথাও সেভাবে পড়ানো হয় না। আমি বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম! আমি কোনো লজ্জা ছাড়াই বলছি, আমাদের ইসলামিক স্টাডিজে যে সাবজেক্টটি এতিমে পরিণত হয়েছে তা হলো কুরআন। আর এ নিয়ে আমাদের মনে কোনো অনুশোচনাও নেই। —নোমান আলী খান

http://youtube.com/post/Ugkx_stMxMhMZIbGOtXXs2S_wdm8ARtPyp_J?si=7Q89ZwifHi1BL9ye

​সূরা আল-হুমাজাহ্ (পরিচয় ও পটভূমি)

আসসালামু আলাইকুম

​সূরা আল-হুমাজাহ্ (পরিচয় ও পটভূমি)

 উস্তাদ নোমান আলী খান 



​এটি একটি মক্কী সূরা। এই সূরায় আল্লাহ তাআলা মানুষের এমন কিছু মারাত্মক চারিত্রিক ব্যাধি নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা সমাজকে ধ্বংস করে দেয়। বিশেষ করে অর্থ-সম্পদের অহংকার এবং এর কারণে অন্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার মানসিকতাকে এখানে তীব্রভাবে নিন্দা করা হয়েছে।

​আয়াত ১: وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ

অনুবাদ: ধ্বংস বা দুর্ভোগ প্রত্যেক এমন ব্যক্তির জন্য, যে সামনে ও পেছনে মানুষের নিন্দা বা গীবত করে।


  • ওস্তাদের বিশ্লেষণ: নোমান আলী খান ব্যাখ্যা করেন যে, এখানে দুটি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে—'হুমাজাহ' এবং 'লুমাজাহ'।
    • হুমাজাহ (Humazah): যারা মানুষের পেছনে বা পরোক্ষভাবে আঘাত করে। যেমন—কারো অনুপস্থিতিতে গীবত করা, চোখ বা ভ্রু ইশারায় কাউকে নিয়ে উপহাস করা, বা ইঙ্গিতে কাউকে ছোট করা।
    • লুমাজাহ (Lumazah): যারা মানুষের সামনে সরাসরি বা মুখের ওপর অপমান করে। যেমন—দোষত্রুটি খুঁজে বের করা, খোঁটা দেওয়া, বা সবার সামনে কাউকে লজ্জিত করা।
  • শিক্ষা: আল্লাহ এখানে 'ওয়াইল' (ধ্বংস বা দুর্ভোগ) শব্দ দিয়ে শুরু করেছেন, যা অত্যন্ত কঠোর একটি সতর্কবার্তা। অন্যের সম্মানহানি করা আল্লাহর কাছে কত বড় অপরাধ, তা এই আয়াত থেকে স্পষ্ট।

​আয়াত ২-৩: الَّذِي جَمَعَ مَالًا وَعَدَّدَهُ * يَحْسَبُ أَنَّ مَالَهُ أَخْلَدَهُ

অনুবাদ: যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে। সে মনে করে যে, তার ধন-সম্পদ তাকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে।


  • ওস্তাদের বিশ্লেষণ: এই আয়াতগুলোতে পূর্বের আচরণের (মানুষকে ছোট করার) মূল কারণ বা 'রুট কজ' চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষ কেন অন্যকে তুচ্ছ ভাবে? কারণ তার টাকা-পয়সা আছে।
    • 'জামা‘আ মালান ওয়া ‘আদ্দাদাহ': সে কেবল টাকা জমায় না, বরং সেটা বারবার গণনা করে পরম তৃপ্তি পায়। তার সমস্ত সুখ ও নিরাপত্তা আটকে থাকে ব্যাংকের ব্যালেন্স বা সম্পদের হিসাবের মধ্যে।
    • ভুল ধারণা: সে অবচেতনভাবেই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, এই সম্পদ তাকে অমরত্ব দেবে, তাকে সব বিপদ ও মৃত্যু থেকে বাঁচিয়ে রাখবে। ওস্তাদ নোমান বলেন, মানুষ মুখে হয়তো স্বীকার করে সে মারা যাবে, কিন্তু তার ভেতরের অহংকার এমন রূপ নেয় যে সে মনে করে "টাকা থাকলে আমার কোনো ক্ষতি কেউ করতে পারবে না।"

​আয়াত ৪-৫: كَلَّا ۖ لَيُنبَذَنَّ فِي الْحُطَمَةِ * وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْحُطَمَةُ

অনুবাদ: কখনই নয়! সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে 'হুতামাহ'-তে। আর আপনি কি জানেন 'হুতামাহ' কী?


  • ওস্তাদের বিশ্লেষণ: আল্লাহ তীব্রভাবে এই অহংকারকে প্রত্যাখ্যান করে বলছেন 'কাল্লা' (কখনোই নয়!)।
    • 'লুয়াম্বাযান্না': এর অর্থ তাকে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হবে। যেভাবে মানুষ কোনো তুচ্ছ ময়লা বা আবর্জনা ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলে, ঠিক সেভাবে এই অহংকারী ধনীদের জাহান্নামে ছুড়ে ফেলা হবে। কারণ তারা দুনিয়ায় মানুষকে তুচ্ছ ভেবেছিল।
    • হুতামাহ (Al-Hutamah): এর আক্ষরিক অর্থ যা সবকিছুকে পিষে বা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে। আল্লাহ রাসূল (সা.)-কে প্রশ্ন করছেন, "আপনি কি জানেন হুতামাহ কী?"—এটি এর ভয়াবহতা বোঝানোর একটি অলংকারিক পদ্ধতি।

​আয়াত ৬-৭: نَارُ اللَّهِ الْمُوقَدَةُ * الَّتِي تَطَّلِعُ عَلَى الْأَفْئِدَةِ

অনুবাদ: এটা আল্লাহর প্রজ্বলিত আগুন। যা মানুষের হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছাবে।


  • ওস্তাদের বিশ্লেষণ:
    • 'নারুল্লাহ': এটিকে সাধারণ আগুন বলা হয়নি, বলা হয়েছে "আল্লাহর আগুন"। অর্থাৎ এর তীব্রতা ও ভয়াবহতা কল্পনাতীত।
    • হৃদয় পুড়বে কেন? নোমান আলী খান এখানে একটি চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক পয়েন্ট তুলে ধরেন। সাধারণ আগুন চামড়া ও মাংস পোড়ায়। কিন্তু এই আগুন সরাসরি 'আফইদাহ' (হৃদয়/কলিজা) পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। কেন? কারণ এই মানুষগুলো তাদের হৃদয় দিয়ে অহংকার করেছিল, এবং তাদের কথার ধারালো তীর দিয়ে অন্যের 'হৃদয়' ভেঙেছিল। তাই শাস্তির শুরুটাও হবে হৃদয় থেকে।

​আয়াত ৮-৯: إِنَّهَا عَلَيْهِم مُّؤْصَدَةٌ * فِي عَمَدٍ مُّمَدَّدَةٍ

অনুবাদ: নিশ্চয় তা তাদেরকে চারদিক থেকে পরিবেষ্টন করে বন্ধ করে দেওয়া হবে। লম্বা লম্বা খুঁটিসমূহে।


  • ওস্তাদের বিশ্লেষণ:
    • 'মু’স্বাদাহ': এর অর্থ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ বা সিলগালা করে দেওয়া। চোর বা অপরাধীদের যেমন বন্দি করে রাখা হয়, তেমনি তাদের চারপাশ থেকে লক করে দেওয়া হবে, যেন পালানোর বা বাতাস পাওয়ার কোনো সুযোগ না থাকে।
    • 'ফী ‘আमाদিম মুমাদ্দাদাহ': লম্বা লম্বা খুঁটি বা কলাম দিয়ে সেই দরজাগুলো বাইরে থেকে আটকে দেওয়া হবে। ওস্তাদ নোমান বলেন, এটি চরম হতাশার এক দৃশ্য। অপরাধী যখন জানবে যে বের হওয়ার সব রাস্তা চিরতরে সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে, তখন তার ভেতরের মানসিক আজাব শারীরিক আজাবের চেয়েও বহু গুণ বেড়ে যাবে।

​মূল সারসংক্ষেপ ও শিক্ষা

​ওস্তাদ নোমান আলী খানের লেকচার থেকে এই সূরার মূল শিক্ষা হলো:

১. জিহ্বা ও আচরণের নিয়ন্ত্রণ: কাউকে উপহাস করা, খোটা দেওয়া বা পেছনে গীবত করা—ইসলামে এটি অত্যন্ত গুরুতর পাপ।

২. সম্পদের মোহ: সম্পদ থাকা পাপ নয়, কিন্তু সম্পদকে অহংকারের উৎস বানানো এবং এর ওপর ভরসা করে পরকাল ভুলে যাওয়া ধ্বংসের কারণ।

৩. কর্মের প্রতিফল: দুনিয়ায় যারা মানুষকে মানসিকভাবে কষ্ট দিয়ে তাদের হৃদয় ভেঙেছে, আখিরাতে আল্লাহর আগুন তাদের হৃদয়কে পুড়িয়ে এর শাস্তি দেবে।


সংগ্রহকৃত : NAK BANGLA

বাংলা ডাবিং মূল ভিডিও : 

https://youtu.be/hhBPKZPZ6TI?si=dkOtlyCASPWZPbUb


বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

সূরা আসরের মূলভাব (নোমান আলী খান)

আসসালামু আলাইকুম

সূরা আসরের মূলভাব (নোমান আলী খান)


​**** আপনি যদি নিজেকে পানির নিচে কল্পনা করেন, যেখানে আপনার শ্বাস নেওয়ার মতো আর কোনো বাতাস নেই। আপনি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছেন। এমতাবস্থায় আপনার কাছে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় বাকি আছে। আপনার ফুসফুসের সব বাতাস শেষ হয়ে আসছে এবং আপনার হৃদস্পন্দন প্রচণ্ড দ্রুত হয়ে যাচ্ছে।
​**** দিনের শেষ সময়কে যেমন 'আসর' বলা হয়, তেমনই আমাদের জীবন থেকেও সময় ঠিক এভাবেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছু এক এক করে হারিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এই ডুবন্ত অবস্থায় কোনো সুন্দর স্বপ্ন দেখতে চান, তাহলেও কিন্তু বাস্তবে আপনার মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। আপনি আপনার মাথায় সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা করতে পারেন, যেমন—আমি ব্যবসার একটা নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করব বা অনেক টাকা আয় করব। কিন্তু এই মুহূর্তে আপনার ফুসফুস থেকে শেষ বাতাসটুকুও বের হয়ে যাচ্ছে। আপনি কেবল কয়েক সেকেন্ডের জন্য জীবিত আছেন।
​**** আপনি যদি পরিস্থিতিটা উপলব্ধি করতে পারেন, তাহলে বুঝতে পারবেন যে আপনি আসলেই পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছেন। কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ এই অবস্থায় পানির নিচে ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। যদি কেউ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার সময়ও ঘুমিয়ে থাকে, তার মানে সে সম্পূর্ণ পাগল অথবা সে কোনো বড় রকমের ঘোরের মধ্যে আছে। যদি আপনি দেখেন যে কোনো মানুষ পানির নিচে ডুবে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি এতটা খারাপ হওয়া সত্ত্বেও সে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে—তাহলে তার এই ঘুম কিন্তু স্বাভাবিক ঘুম নয়, এটা আসলে তার মৃত্যুর লক্ষণ।
​**** কিন্তু আপনি যখন জেগে আছেন এবং দেখছেন পরিস্থিতি খুব খারাপ, আপনি ডুবে যাচ্ছেন, তখন কি আপনি অলস বসে থাকবেন? অবশ্যই না! আপনি আপনার সমস্ত শক্তি দিয়ে পানির ওপরে ওঠার চেষ্টা করবেন। আপনি ছটফট করবেন, হাত-পা ছুড়বেন। এই ছটফটানির অর্থ হলো—আপনি পরিস্থিতিটা বুঝতে পেরেছেন এবং বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। প্রথমত, আপনাকে পানির ওপর ওঠার জন্য হাত-পা ছুড়তে হবে। আপনার চারপাশের বাধাগুলোকে সরিয়ে ওপরে উঠতে হবে। আপনি যখন পানির নিচে হাত-পা ছুড়ছেন, তার মানে আপনি আপনার সমস্ত শক্তি দিয়ে মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন।
​**** যখন আপনার এই ছটফটানি তীব্র হয়, তখন আপনার পাশে যদি আপনার কোনো ভাই বা প্রিয়জন থাকে, তখন কি আপনি তার সাথে কোনো সাধারণ আড্ডা দেবেন? কিংবা বলবেন যে 'ভাইয়া, তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি'? না! তখন আপনি তাকেও টেনে ওপরে তোলার চেষ্টা করবেন। কারণ পরিস্থিতি এমন যে আপনি তাকে না তুললে সেও ডুবে মরবে। আপনি একা একা বাঁচতে পারবেন না।
​**** এখন যদি আপনার সেই প্রিয় মানুষটি পানির নিচে ঘুমিয়ে থাকে এবং সে বুঝতে না পারে যে সে ডুবে যাচ্ছে, তখন আপনি কী করবেন? আপনি তাকে ধাক্কা দেবেন, জোরে ঝাকুনি দেবেন এবং বলবেন, "আরে ওঠো! ওঠো! আমরা ডুবে যাচ্ছি!" আপনি তাকে জাগানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাবেন। আপনার নিজের নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসা পর্যন্ত আপনি তাকে জাগানোর চেষ্টা করবেন। আপনি ততক্ষণ চেষ্টা করবেন যতক্ষণ না সে চোখ খোলে।
​**** এরপর যখন সে জেগে উঠবে, তখন সেও আপনার সাথে সাথে ছটফট করা শুরু করবে। এভাবে আপনি আপনার পরিবার, আপনার বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান এবং বন্ধুদের বাঁচাতে চেষ্টা করবেন। এই ডুবন্ত অবস্থা থেকে বাঁচতে হলে মানুষকে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং সবাইকে জাগিয়ে তুলতে হবে। সবাইকে একসাথে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে।
​**** চলার পথে হয়তো কোনো এক সময় আপনার মনে হতে পারে—"আমি আর পারছি না, আমার দম ফুরিয়ে আসছে।" তখন আপনার সাথে থাকা অন্য মানুষটি আপনাকে বলবে, "না ভাই, হাল ছেড়ো না। আমরা আর একটু চেষ্টা করলেই ওপরে পৌঁছে যাব।" এভাবেই একে অপরকে সাহস জোগাতে হবে এবং ধৈর্য ধারণ করতে হবে। আমরা একা কেউ বাঁচতে পারব না, ইনশাআল্লাহ আমরা সবাই একসাথে ওপরে উঠব। আমাদের চারপাশের সমাজব্যবস্থায় আমরা প্রায়ই দেখি, যখন একজন মানুষ কোনো বিপদে পড়ে বা ভেঙে পড়ে, তখন অন্য মানুষরা তাকে সান্ত্বনা দেয়, সাহস দেয় এবং একসাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে।
​**** এখন দেখা যাক, আল্লাহ তাআলা এই সূরায় কী বলেছেন:
১. والعصر (সময়ের কসম): সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে।
২. إن الإنسان لفي خسر (নিশ্চয়ই মানুষ চরম ক্ষতিতে নিমজ্জিত): মানুষ প্রতিনিয়ত সময়ের অতল গহ্বরে ডুবে যাচ্ছে।
​**** তবে এই ক্ষতি থেকে কেবল তারাই বাঁচতে পারবে, যারা বিশেষ কিছু গুণ অর্জন করবে। আল্লাহ এখানে সাধারণ মানুষের কথা বলেননি, বরং বলেছেন:
​إلا الذين آمنوا (তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে): যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে। যারা বুঝতে পেরেছে যে তারা ডুবে যাচ্ছে এবং তাদের এই জীবনটা চিরস্থায়ী নয়।
​وعملوا الصالحات (এবং নেক আমল করেছে): অর্থাৎ যারা শুধু ঈমান এনে বসে থাকেনি, বরং হাত-পা ছুড়েছে, আমল ভালো করেছে এবং নিজেকে বাঁচানোর প্রতিকূল চেষ্টা করেছে।
​وتواصوا بالحق (এবং একে অপরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে): শুধু নিজে বাঁচলে হবে না, আপনার পাশে যে ঘুমিয়ে আছে বা ডুবে যাচ্ছে, তাকেও ডেকে তুলতে হবে। তাকে বারবার সত্যের দিকে ডাকতে হবে। কারণ আপনি যদি তাকে না ডাকেন, সে হয়তো চিরতরে ঘুমিয়ে পড়বে। আর আপনি তাকে একা ফেলে ওপরে উঠে যেতে পারেন না।
​وتواصوا بالصبر (এবং একে অপরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে): এই সত্যের পথে চলতে গেলে আপনার দম ফুরিয়ে আসবে, আপনি ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। তখন একে অপরকে বলতে হবে—"ধৈর্য ধরো, লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ো না, আমরা আর একটু গেলেই মুক্তি পাব।"
​**** আপনি যদি আপনার পরিবার এবং সমাজের মানুষদের অবহেলা করেন, তাদের ভালো কাজের দিকে না ডাকেন, তাহলে আপনি নিজেকে যতই ধার্মিক মনে করেন না কেন—বাস্তবে আপনি সবাইকে নিয়ে একসাথে ডুবে যাচ্ছেন। তাই নিজেকে এবং অন্য সবাইকে ক্ষতি থেকে বাঁচাতে হলে এই চারটি শর্তই পূরণ করতে হবে। এটিই সূরা আসরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

​(ভিডিওর উৎস: NAKInBangla - সূরা আসরের মূলভাব)

ডাবিং ভিডিও লিংক : https://youtu.be/J6HoIsOkV8A?si=SozA3vrs2O6e9gFG


পাপে আসক্ত থাকার চেয়েও ভয়াবহ হলো আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া।


এখন আমি এমন একটি কথা বলতে চাই যা অনেকের কাছে বিতর্কিত মনে হতে পারে। আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাজত করুন। তবু আমি নির্দ্বিধায় বলব।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনি যে পাপের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলছেন—আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন—সেই পাপকে আপনার অন্যান্য সৎকর্ম সম্পাদনের পথে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে দিবেন না। 

বরং, সেই পাপকেই আপনার অনুপ্রেরণার উৎস করে তুলুন, যেন তা আপনাকে এমন সব নেক আমল করতে বাধ্য করে, যা সাধারণ অবস্থায় আপনি কখনো করতেন না।

আবারও বলছি—আমার কথাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করবেন না। আমি পাপকে বৈধতা দিচ্ছি না। অনেকে আমার কথাকে ভুল বুঝে সমস্যা তৈরি করে। আমি শুধু বলছি — যদি আপনি কোনো আসক্তির গভীরে আটকে পড়ে যান, যেকোনো আসক্তি, যেকোনো অভ্যাসগত পাপ — তাহলে আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার বদলে সেই পাপকেই কাজে লাগান। তাকে আপনার ইবাদতের চালিকাশক্তি বানান—এমনসব ইবাদতের যেগুলো  অন্যথায় আপনি কখনো করতেন না।

এমনকি যদি আপনি সেই পাপ ছাড়তে না-ও পারেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, এমনকি যদি তা পরিত্যাগ করতে না পারেন, আবারও বলছি, আমি বৈধতা দিচ্ছি না, আমাকে ভুল বুঝবেন না—কিন্তু আমি বলছি, ওই পাপ যেন আপনাকে আরও নিচে নামিয়ে দেওয়ার সুযোগ না পায়। 

বরং সেই পাপটিকেই নিজেকে এমন সব ভালো কাজে বাধ্য করার হাতিয়ার বানিয়ে নিন, যা অন্যথায় আপনি কখনোই করতেন না। কারণ, আপনি যে অমুক পাপে আসক্ত। 

তখন নিজেকে বলুন — ঠিক আছে, আমি সপ্তাহে দুই রাত তাহাজ্জুদের জন্য উঠব। দুই রাত। কারণ আমি জানি আমি এমন কিছু করছি যা করা উচিত নয়। অথবা বলুন — আমি আমার খালার প্রতি আরও যত্নশীল হব, তাঁর সাহায্য দরকার। চাচার কাছে যাব, তাঁদের সেবা করব—খিদমত করব—কারণ আমি চাই আল্লাহ আমাকে মাফ করুন।

আর এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই —এই সামান্য প্রচেষ্টাগুলোই— আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করুন। বলুন — হে আল্লাহ, আমি জানি আমি উত্তম মানুষ নই। কিন্তু আমি আসলে অতিরিক্ত কিছু নেক আমল করছি। 

আপনারা সবাই সেই বিখ্যাত হাদিসটির কথা জানেন — সেই নারীর কথা,পতিতা, যে একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়েছিল। সেই হাদিস তো জানেন তাই না? আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা  সেই নারীকে ক্ষমা করলেন কেন? কারণ সে অনুভব করেছিল — গভীরভাবে অনুভব করেছিল — যে তার আল্লাহর ক্ষমা প্রয়োজন। আর যে মন সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে ক্ষমা পাবেই।

আমি বলছি না, পাপটি করতে থাকো — আস্তাগফিরুল্লাহ। আমি বলছি, সেই পাপটাকে আপনার এমনসব ভালো কাজ করার মূল অনুপ্রেরণা বানিয়ে নিন, যেগুলো অন্যথায় আপনি করতেন না। আপনি আসলে যতটা খারাপ, শয়তান যেন আপনাকে তার চেয়েও বেশি নিকৃষ্ট না ভাবায়। শয়তানকে এই সুযোগ দিবেন না। 

হ্যাঁ, পাপে আসক্ত থাকাটা খারাপ—মুক্ত থাকাটাই আপনার জন্য উত্তম হতো। কিন্তু পাপে আসক্ত থাকার চেয়েও ভয়াবহ হলো আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া।
আপনি পাপে আসক্ত থেকেও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারবেন। আপনি পারবেন।   সেটা সর্বোত্তম সম্পর্ক হবে না— এ কথা আমি স্বীকার করি। কিন্তু কিছুটা সম্পর্ক তো থাকবে। আর সেই সম্পর্কটুকু আঁকড়ে ধরুন। কারণ সেটা আল্লাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেয়ে হাজারগুণ ভালো।

— শায়েখ ইয়াসির কাদী



বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

মা-বাবার মৃত্যুর পর তাদের জন্য করণীয় আমলসূমহ

মা-বাবার মৃত্যুর পর তাদের জন্য করণীয় আমলসূমহ ফেইসবুকে শেয়ার করুন   টুইটারে টুইট   প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন...