বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

সূরা আসরের মূলভাব (নোমান আলী খান)

আসসালামু আলাইকুম

সূরা আসরের মূলভাব (নোমান আলী খান)


​**** আপনি যদি নিজেকে পানির নিচে কল্পনা করেন, যেখানে আপনার শ্বাস নেওয়ার মতো আর কোনো বাতাস নেই। আপনি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছেন। এমতাবস্থায় আপনার কাছে মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় বাকি আছে। আপনার ফুসফুসের সব বাতাস শেষ হয়ে আসছে এবং আপনার হৃদস্পন্দন প্রচণ্ড দ্রুত হয়ে যাচ্ছে।
​**** দিনের শেষ সময়কে যেমন 'আসর' বলা হয়, তেমনই আমাদের জীবন থেকেও সময় ঠিক এভাবেই ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমাদের অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছু এক এক করে হারিয়ে যাচ্ছে। আপনি যদি এই ডুবন্ত অবস্থায় কোনো সুন্দর স্বপ্ন দেখতে চান, তাহলেও কিন্তু বাস্তবে আপনার মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। আপনি আপনার মাথায় সুন্দর সুন্দর পরিকল্পনা করতে পারেন, যেমন—আমি ব্যবসার একটা নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করব বা অনেক টাকা আয় করব। কিন্তু এই মুহূর্তে আপনার ফুসফুস থেকে শেষ বাতাসটুকুও বের হয়ে যাচ্ছে। আপনি কেবল কয়েক সেকেন্ডের জন্য জীবিত আছেন।
​**** আপনি যদি পরিস্থিতিটা উপলব্ধি করতে পারেন, তাহলে বুঝতে পারবেন যে আপনি আসলেই পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছেন। কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ এই অবস্থায় পানির নিচে ঘুমিয়ে থাকতে পারে না। যদি কেউ পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার সময়ও ঘুমিয়ে থাকে, তার মানে সে সম্পূর্ণ পাগল অথবা সে কোনো বড় রকমের ঘোরের মধ্যে আছে। যদি আপনি দেখেন যে কোনো মানুষ পানির নিচে ডুবে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি এতটা খারাপ হওয়া সত্ত্বেও সে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে আছে—তাহলে তার এই ঘুম কিন্তু স্বাভাবিক ঘুম নয়, এটা আসলে তার মৃত্যুর লক্ষণ।
​**** কিন্তু আপনি যখন জেগে আছেন এবং দেখছেন পরিস্থিতি খুব খারাপ, আপনি ডুবে যাচ্ছেন, তখন কি আপনি অলস বসে থাকবেন? অবশ্যই না! আপনি আপনার সমস্ত শক্তি দিয়ে পানির ওপরে ওঠার চেষ্টা করবেন। আপনি ছটফট করবেন, হাত-পা ছুড়বেন। এই ছটফটানির অর্থ হলো—আপনি পরিস্থিতিটা বুঝতে পেরেছেন এবং বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। প্রথমত, আপনাকে পানির ওপর ওঠার জন্য হাত-পা ছুড়তে হবে। আপনার চারপাশের বাধাগুলোকে সরিয়ে ওপরে উঠতে হবে। আপনি যখন পানির নিচে হাত-পা ছুড়ছেন, তার মানে আপনি আপনার সমস্ত শক্তি দিয়ে মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন।
​**** যখন আপনার এই ছটফটানি তীব্র হয়, তখন আপনার পাশে যদি আপনার কোনো ভাই বা প্রিয়জন থাকে, তখন কি আপনি তার সাথে কোনো সাধারণ আড্ডা দেবেন? কিংবা বলবেন যে 'ভাইয়া, তোমাকে আমি খুব ভালোবাসি'? না! তখন আপনি তাকেও টেনে ওপরে তোলার চেষ্টা করবেন। কারণ পরিস্থিতি এমন যে আপনি তাকে না তুললে সেও ডুবে মরবে। আপনি একা একা বাঁচতে পারবেন না।
​**** এখন যদি আপনার সেই প্রিয় মানুষটি পানির নিচে ঘুমিয়ে থাকে এবং সে বুঝতে না পারে যে সে ডুবে যাচ্ছে, তখন আপনি কী করবেন? আপনি তাকে ধাক্কা দেবেন, জোরে ঝাকুনি দেবেন এবং বলবেন, "আরে ওঠো! ওঠো! আমরা ডুবে যাচ্ছি!" আপনি তাকে জাগানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাবেন। আপনার নিজের নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আসা পর্যন্ত আপনি তাকে জাগানোর চেষ্টা করবেন। আপনি ততক্ষণ চেষ্টা করবেন যতক্ষণ না সে চোখ খোলে।
​**** এরপর যখন সে জেগে উঠবে, তখন সেও আপনার সাথে সাথে ছটফট করা শুরু করবে। এভাবে আপনি আপনার পরিবার, আপনার বাবা-মা, ভাই-বোন, সন্তান এবং বন্ধুদের বাঁচাতে চেষ্টা করবেন। এই ডুবন্ত অবস্থা থেকে বাঁচতে হলে মানুষকে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং সবাইকে জাগিয়ে তুলতে হবে। সবাইকে একসাথে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে।
​**** চলার পথে হয়তো কোনো এক সময় আপনার মনে হতে পারে—"আমি আর পারছি না, আমার দম ফুরিয়ে আসছে।" তখন আপনার সাথে থাকা অন্য মানুষটি আপনাকে বলবে, "না ভাই, হাল ছেড়ো না। আমরা আর একটু চেষ্টা করলেই ওপরে পৌঁছে যাব।" এভাবেই একে অপরকে সাহস জোগাতে হবে এবং ধৈর্য ধারণ করতে হবে। আমরা একা কেউ বাঁচতে পারব না, ইনশাআল্লাহ আমরা সবাই একসাথে ওপরে উঠব। আমাদের চারপাশের সমাজব্যবস্থায় আমরা প্রায়ই দেখি, যখন একজন মানুষ কোনো বিপদে পড়ে বা ভেঙে পড়ে, তখন অন্য মানুষরা তাকে সান্ত্বনা দেয়, সাহস দেয় এবং একসাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে।
​**** এখন দেখা যাক, আল্লাহ তাআলা এই সূরায় কী বলেছেন:
১. والعصر (সময়ের কসম): সময় খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে।
২. إن الإنسان لفي خسر (নিশ্চয়ই মানুষ চরম ক্ষতিতে নিমজ্জিত): মানুষ প্রতিনিয়ত সময়ের অতল গহ্বরে ডুবে যাচ্ছে।
​**** তবে এই ক্ষতি থেকে কেবল তারাই বাঁচতে পারবে, যারা বিশেষ কিছু গুণ অর্জন করবে। আল্লাহ এখানে সাধারণ মানুষের কথা বলেননি, বরং বলেছেন:
​إلا الذين آمنوا (তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে): যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে। যারা বুঝতে পেরেছে যে তারা ডুবে যাচ্ছে এবং তাদের এই জীবনটা চিরস্থায়ী নয়।
​وعملوا الصالحات (এবং নেক আমল করেছে): অর্থাৎ যারা শুধু ঈমান এনে বসে থাকেনি, বরং হাত-পা ছুড়েছে, আমল ভালো করেছে এবং নিজেকে বাঁচানোর প্রতিকূল চেষ্টা করেছে।
​وتواصوا بالحق (এবং একে অপরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে): শুধু নিজে বাঁচলে হবে না, আপনার পাশে যে ঘুমিয়ে আছে বা ডুবে যাচ্ছে, তাকেও ডেকে তুলতে হবে। তাকে বারবার সত্যের দিকে ডাকতে হবে। কারণ আপনি যদি তাকে না ডাকেন, সে হয়তো চিরতরে ঘুমিয়ে পড়বে। আর আপনি তাকে একা ফেলে ওপরে উঠে যেতে পারেন না।
​وتواصوا بالصبر (এবং একে অপরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে): এই সত্যের পথে চলতে গেলে আপনার দম ফুরিয়ে আসবে, আপনি ক্লান্ত হয়ে পড়বেন। তখন একে অপরকে বলতে হবে—"ধৈর্য ধরো, লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ো না, আমরা আর একটু গেলেই মুক্তি পাব।"
​**** আপনি যদি আপনার পরিবার এবং সমাজের মানুষদের অবহেলা করেন, তাদের ভালো কাজের দিকে না ডাকেন, তাহলে আপনি নিজেকে যতই ধার্মিক মনে করেন না কেন—বাস্তবে আপনি সবাইকে নিয়ে একসাথে ডুবে যাচ্ছেন। তাই নিজেকে এবং অন্য সবাইকে ক্ষতি থেকে বাঁচাতে হলে এই চারটি শর্তই পূরণ করতে হবে। এটিই সূরা আসরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

​(ভিডিওর উৎস: NAKInBangla - সূরা আসরের মূলভাব)

ডাবিং ভিডিও লিংক : https://youtu.be/J6HoIsOkV8A?si=SozA3vrs2O6e9gFG


পাপে আসক্ত থাকার চেয়েও ভয়াবহ হলো আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া।


এখন আমি এমন একটি কথা বলতে চাই যা অনেকের কাছে বিতর্কিত মনে হতে পারে। আল্লাহ আমাদের সকলকে হেফাজত করুন। তবু আমি নির্দ্বিধায় বলব।
প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আপনি যে পাপের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলছেন—আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন—সেই পাপকে আপনার অন্যান্য সৎকর্ম সম্পাদনের পথে কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে দিবেন না। 

বরং, সেই পাপকেই আপনার অনুপ্রেরণার উৎস করে তুলুন, যেন তা আপনাকে এমন সব নেক আমল করতে বাধ্য করে, যা সাধারণ অবস্থায় আপনি কখনো করতেন না।

আবারও বলছি—আমার কথাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করবেন না। আমি পাপকে বৈধতা দিচ্ছি না। অনেকে আমার কথাকে ভুল বুঝে সমস্যা তৈরি করে। আমি শুধু বলছি — যদি আপনি কোনো আসক্তির গভীরে আটকে পড়ে যান, যেকোনো আসক্তি, যেকোনো অভ্যাসগত পাপ — তাহলে আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার বদলে সেই পাপকেই কাজে লাগান। তাকে আপনার ইবাদতের চালিকাশক্তি বানান—এমনসব ইবাদতের যেগুলো  অন্যথায় আপনি কখনো করতেন না।

এমনকি যদি আপনি সেই পাপ ছাড়তে না-ও পারেন, আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, এমনকি যদি তা পরিত্যাগ করতে না পারেন, আবারও বলছি, আমি বৈধতা দিচ্ছি না, আমাকে ভুল বুঝবেন না—কিন্তু আমি বলছি, ওই পাপ যেন আপনাকে আরও নিচে নামিয়ে দেওয়ার সুযোগ না পায়। 

বরং সেই পাপটিকেই নিজেকে এমন সব ভালো কাজে বাধ্য করার হাতিয়ার বানিয়ে নিন, যা অন্যথায় আপনি কখনোই করতেন না। কারণ, আপনি যে অমুক পাপে আসক্ত। 

তখন নিজেকে বলুন — ঠিক আছে, আমি সপ্তাহে দুই রাত তাহাজ্জুদের জন্য উঠব। দুই রাত। কারণ আমি জানি আমি এমন কিছু করছি যা করা উচিত নয়। অথবা বলুন — আমি আমার খালার প্রতি আরও যত্নশীল হব, তাঁর সাহায্য দরকার। চাচার কাছে যাব, তাঁদের সেবা করব—খিদমত করব—কারণ আমি চাই আল্লাহ আমাকে মাফ করুন।

আর এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই —এই সামান্য প্রচেষ্টাগুলোই— আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করুন। বলুন — হে আল্লাহ, আমি জানি আমি উত্তম মানুষ নই। কিন্তু আমি আসলে অতিরিক্ত কিছু নেক আমল করছি। 

আপনারা সবাই সেই বিখ্যাত হাদিসটির কথা জানেন — সেই নারীর কথা,পতিতা, যে একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি পান করিয়েছিল। সেই হাদিস তো জানেন তাই না? আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা  সেই নারীকে ক্ষমা করলেন কেন? কারণ সে অনুভব করেছিল — গভীরভাবে অনুভব করেছিল — যে তার আল্লাহর ক্ষমা প্রয়োজন। আর যে মন সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে ক্ষমা পাবেই।

আমি বলছি না, পাপটি করতে থাকো — আস্তাগফিরুল্লাহ। আমি বলছি, সেই পাপটাকে আপনার এমনসব ভালো কাজ করার মূল অনুপ্রেরণা বানিয়ে নিন, যেগুলো অন্যথায় আপনি করতেন না। আপনি আসলে যতটা খারাপ, শয়তান যেন আপনাকে তার চেয়েও বেশি নিকৃষ্ট না ভাবায়। শয়তানকে এই সুযোগ দিবেন না। 

হ্যাঁ, পাপে আসক্ত থাকাটা খারাপ—মুক্ত থাকাটাই আপনার জন্য উত্তম হতো। কিন্তু পাপে আসক্ত থাকার চেয়েও ভয়াবহ হলো আল্লাহ থেকে দূরে সরে যাওয়া।
আপনি পাপে আসক্ত থেকেও আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারবেন। আপনি পারবেন।   সেটা সর্বোত্তম সম্পর্ক হবে না— এ কথা আমি স্বীকার করি। কিন্তু কিছুটা সম্পর্ক তো থাকবে। আর সেই সম্পর্কটুকু আঁকড়ে ধরুন। কারণ সেটা আল্লাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার চেয়ে হাজারগুণ ভালো।

— শায়েখ ইয়াসির কাদী



বৈশিষ্ট্যযুক্ত পোস্ট

মা-বাবার মৃত্যুর পর তাদের জন্য করণীয় আমলসূমহ

মা-বাবার মৃত্যুর পর তাদের জন্য করণীয় আমলসূমহ ফেইসবুকে শেয়ার করুন   টুইটারে টুইট   প্রবন্ধটি পড়া হলে, শেয়ার করতে ভুলবেন...